Kishore Kumar – My Everlasting Memory

২২টা বছর ধরে একটা স্মৃতি বয়ে বেড়াচ্ছি। ১৩ অক্টোবর, ১৯৮৭।

বাড়ির গেট থেকে ভাইয়ের চিৎকার। “দাদা কিশোরকুমার মারা গেছেন”। (ভাই কোথাও একটা গিয়েছিল। তাড়াহুড়ো করে ফিরে এসেছিল।)

দিল্লী দূরদর্শনে রিনি সাইমনের (এখন খান্না) রাত নটার খবর পড়া। “The noted singer Kishore kumar is no more”।

বাংলা দূরদর্শনের অবহেলা।

পরের দিন সব বাংলা কাগজ কেনা।

 

 

Posted via web from ফেরারি মন

Advertisements

সেদিনের সোনা ঝরা সন্ধ্যা

//www.thehindu.com/mp/2008/05/14/stories/2008051450590100.htm)গত দশই মে, ব্যাঙ্গালোরের চৌডাইয়া মেমোরিয়াল হলে মান্না দের গান শুনলাম। সঙ্গে বিনাকা/সিবাকা গীতমালা খ্যাত আমিন সায়ানি

টিকিটের দাম ভাল। তবুও লোকজনের সমাগম বেশ ভালই হয়েছিল। দর্শকের গড় বয়স প্রায় ৪০ (চল্লিশ)। কোন স্কুল অথবা কলেজ ছাত্র চোখে পড়ল না। হয়তো কোন মান্না কণ্ঠী এলে, এনারা আসতেন!

৮৯ বছরের মান্না দে প্রায় তিন ঘণ্টা গান করলেন। শুধু আমার ভাল লেগেছে বললে কম বলা হয়। গলায় বয়সের ছাপ কখনো কখনো ধরা পড়েছে। তবে হাতি বসলেও ঘোড়ার চেয়ে লম্বা থাকে! অনেকের অনুরোধে মাত্র একটা বাংলা গান গাইলেন। “এই কুলে আমি আর ওই কুলে তুমি….”।

আমিন সায়ানির সঙ্গে অনেক গল্প করলেন। মান্না দে হিন্দী এবং বাংলায়, ওনার সময়ের প্রায় সব নায়কের গলায় গান গেয়েছেন। এমনকি কিশোরকুমারের জন্য প্লেব্যাক করেছেন। হঠাৎ গভীর রাত্রে উনি কিশোরের ফোন পেলেন। গভীর রাত্রে ফোন পেয়ে উনি অবাক। গম্ভীর গলায় ফিসফিস করে (যাতে কেউ না শুনে ফেলে!) কিশোর মান্নাদাকে জানিয়ে দিলেন যে মান্নাদা যদি পরের দিন কিশোরের জন্য গান রেকর্ডিং না করেন, তা হলে ভাল হয়। মান্নাদার খুব কৌতুহল! কোথা থেকে কিশোর ফোন করছেন? কিশোর মহাবালেশ্বরে। প্রডিউসার নাকি কিশোরকে পারিশ্রমিক দেন নি। তাই কিশোর প্রডিউসারকে ফাঁকি দিয়েছেন। গানটা নাকি কিশোরের গাওয়ার কথা ছিল। সিনেমার নামটা মান্না দে বলেন নি। আমিও জানি না।

আরও অনেক গল্প করেছেন। ছেলেবেলার গল্প। মদনমোহন, শচীন কর্তা এবং রাহুল দেবের গল্প। ওনার কাছ থেকে জানা গেল যে সায়গাল কৃষ্ণচন্দ্র দে মহাশয়কে কিষ্টবাবু বলে ডাকতেন। লতা মঙ্গেশকরের সঙ্গে মান্না দের পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন অনিল বিশ্বাস।

সব মিলিয়ে অসাধারণ স্মরণীয় এক সন্ধ্যা।

Musical Notation of Kishore Kumar

Kishore Kumar with Kanu Bhattacharjee for a song of Bangla (Bengali) movie Dolonchnapa.Kishore Kumar with Kanu Bhattacharjee for a song of Bangla (Bengali) movie Dolonchnapa. Hosted on Zooomr
আধুনিক বাংলা গানের বিখ্যাত গীতিকার পুলক বন্দোপাধ্যায়ের “কথায় কথায় রাত হয়ে যায়” বইটি আমার প্রিয়। শুধু কিশোরকুমার নয়, বাংলা গানের অনেক বিখ্যাত গায়ক এবং গায়িকাদের কথা উনি লিখেছেন।

আমরা সবাই জানি কিশোরকুমার গানের স্বরলিপি লিখতে অথবা পড়তে পারতেন না। “কথায় কথায় রাত হয়ে যায়” বইটির ১৬২-১৬৩ পৃষ্ঠা থেকে জানা যায় যে পুলকবাবুও তাই জানতেন। কিশোরদা একদিন ওনাকে বলেছিলেন “গান শুধু গাইতে জানি। গানের ও-সব গ্রামার ট্রামার, ওই সব সারে গামা টামা আমি কিছুই জানি না।”

বইটির ১৬২-১৬৩ পৃষ্ঠায় আরো অনেক তথ্য আছে এই বিষয়। পারাবত প্রিয়ার ছবির ‘অনেক জমানো ব্যথা বেদনা’ গানের রেকর্ডিং চলছে। সুরকার অজয় দাস। কিন্তু কিশোরদা ভুল করে ‘অনেক’-এর পর ছেদ দিচ্ছেন। অজয়বাবু এবং পুলকবাবু আপত্তি জানাতে রেকর্ডিং বুথে ঢুকে পড়লেন। কিশোরদা আপত্তি মেনে নিলেন। সামনে ঝোলানো গানের কাগজে একটা আঁচর কাটলেন। আবার গাইলেন গানটা। পুলকবাবু তখনও কিন্তু রেকর্ডিং বুথের ভিতর দাঁড়িয়ে। সুরের একটা ভুল হতে অজয়বাবু রেকর্ডিং মেশিনের কাছ থেকে মাইক্রোফোনে সেটা গেয়ে দেখিয়ে দিলেন। কিশোর কুমার দেখলেন বার বার একটা জায়গায় ভুল হচ্ছে। পুলকবাবুর কাছ থেকে কলম চেয়ে নিয়ে গানের কথার ওপর সেটা লিখে নিলেন। গীতিকার পুলক বন্দোপাধ্যায় স্বচক্ষে দেখলেন কিশোর কুমার হুবহু মান্না দের মত গানের কথার ওপর শর্টহ্যান্ড স্বরলিপি লিখে রাখলেন। পুলকবাবু অবাক। ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইলেন। কিশোরকুমার একমুখ হেসে পুলকবাবুকে বলে উঠলেন “না না আমি ওইসব শর্ট হ্যাণ্ড নোটেশন ফোটেশন জানি না। ওসব মান্নদা জানেনে। আমি শুধু লিখে নিলাম। আপনার এই ব্যাথা বেদনার শেষ লাইনটাতে ‘বুঝেও কেন বুঝল না সে / কী আমার শুভ কামনা।’ এই ‘শুভ কামনা’-য় আমার গলাটা কেমন ঘুরবে, এই দেখুন নোটেশন আমি লিখিনি, শুধু ‘শুভ কামনা’ শব্দটার নীচে একটা গোল দাগ টেনে দিয়েছি।” পুলক বন্দোপাধ্যায় দেখলেন গানের কাগজে মান্নাদা যেমনভাবে স্বরলিপির আঁচড় দেন, কিশোরদা তেমনি আঁচর দিয়েছেন। তবে সেগুলো কিশোরকুমারের নিজস্ব আঁকিবুঁকি।

এই হলেন গানের রাজা কিশোরকুমার। উনি বাংলা লিখতে এবং পড়তে জানতেন না। তাই বাংলা গান হিন্দীতে লিখে নিতেন। কেমন হত সেই লেখা? আনন্দলোকের ১৯৮৭র ৩১শে অক্টোবারের সংখ্যার ৩৯ পৃষ্ঠায় যেতে হবে।

A Bangla (Bengali) song lyrics in Kishore Kumar's own handwriting - Part 1A Bangla (Bengali) song lyrics in Kishore Kumar’s own handwriting – Part 1 Hosted on Zooomr

A Bangla (Bengali) song lyrics in Kishore Kumar's own handwriting - Part 2A Bangla (Bengali) song lyrics in Kishore Kumar’s own handwriting – Part 2 Hosted on Zooomr

এবার আপনারা বুঝে নিন, আমাদের কিশোরদা স্বরলিপি লিখতে জানতেন কিনা!

Kishore Kumar and Salil Chowdhury

কিশোরকুমার এবং সলিল চৌধু্রী দুজনেই আমার প্রিয় শিল্পী। হিন্দী এবং বাংলা মিলিয়ে সলিল চৌধুরীর পরিচালনায় কিশোরকুমারের খুব বেশী গান নেই। প্রায় সব গানই কিন্তু ভাল জনপ্রিয়তা পেয়েছে। উইকিপেডিয়াতে সলিল চৌধু্রীর উপর লেখায় কিশোরকুমারের নাম নেই। গানের সংখ্যা কম হতে পারে। কিন্তু একেবারে নাম উল্লেখ না করবার মত অবস্থা নয়। কিছু গান একেবারে অনবদ্য। যেমন হিন্দীতে গুজর যায়ে দিন দিন। বাংলায় কবিতা ছায়াছবির শুন শুন গো সবে। আমার সবচেয়ে দুঃখ লাগে যখন ভাবি যে সলিল চৌধুরীর সুরে কিশোরকুমারের কণ্ঠে কোন আধুনিক বাংলা গান নেই।

কেন এরকম হল? কোনদিন স্পষ্ট করে জানা যাবে না। এখন পর্যন্ত ইন্টানেটে এ বিষয় আলোচনা সামান্যকিশোরকুমারের মৃত্যুর পর সলিল চৌধুরী নানা পত্রিকায় কিশোরকুমারের স্মৃতিচারণ করেছিলেন। সেইরকম কিছু লেখা আমার কাছে আছে। সেই লেখাগুলো পড়ে আমার ব্যক্তিগত মতামত হল যে কোন কারণে সলিল চৌধুরীর সঙ্গে কিশোরকুমারের হয়তো মানসিক দূরত্ম তৈরী হয়েছিল। সলিল চৌধুরী কিশোরকুমারের শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের প্রথাগত শিক্ষার অভাব অনুভব করতেন। আনন্দলোকের ১৯৮৭ সালের ৩১শে অক্টোবরের সংখ্যায় (পৃষ্ঠা ৮২-৮৩) সলিল চৌধুরী বলেছেন –

‘হ্যাঁ, অসাধরণ কন্ঠ ছিল কিশোরের, এ বিষয় কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু কন্ঠ থাকলেই তো আর সব কিছু হয় না। তবে এ কথা বলবো – কিশোরের যদি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের শিক্ষাটা থাকতো, তাহলে কিশোর এক অন্য কিশোর হয়ে উঠতেন। জনপ্রিয়তা দিয়ে বিচার নয়, সাংগীতিক গুণগত সৌকর্যে কিশোর তাহলে সহজেই মহম্মদ রফির স্থানে পৌঁছোতে পারতেন। তবে সংগীতশিল্পী হিসেবে যদি কিশোরের মূল্যায়ন করতে হয়, তাহলে এটাই হয়তো সঙ্গত হবে যদি বলি : কিশোর একটা নতুন স্টাইলের উদ্ভাবন করেছেন – যেটা পপ-স্টাইলের খুব কাছাকাছি। এক্ষেত্রে ওঁর ধারেকাছে পৌঁছোবার মতো কেউ ছিল না। এ কথা আমি জোরের সঙ্গে বলতে পারি।’

এক সময় কিশোরকুমারের মনে হয়েছিল যে সলিল চৌধুরী যেশু দাসকেই বেশী পছন্দ করেন। আনন্দলোকের ওই একই সাক্ষাৎকারে সলিল চৌধুরী বলেছেন –

‘মান অভিমানের পালাও চলতো মাঝে মাঝে। মাঝে মাঝে ভুল বোঝাবুঝিও হয়েছে। যেমন : সত্তর সালের প্রথম দিকের একটা ঘটনা। বাসু ভট্টাচার্যের ‘অন্দর মহল’ নামে একটা ছবির সংগীত পরিচালনার কাজ করছি। ওই ছবিতে যেশু দাসকে দিয়ে আমি একটা গান করাই। এর আগে একটা ছবির গানের জন্য কিশোরকে বলেছিলাম। যে কোন কারণে হোক, সেই ছবিতে কিশোর গাইতে পারেননি। কিশোর ধরে নিয়েছিলেন বাসুবাবুর ছবিতে যেশুকে দিয়ে গান গাইয়ে আমি প্রতিশোধ নেবার চেষ্টা করেছি। ব্যাপারটা অবশ্য আদৌ তা ছিল না। অনেকদিন এই ভুল বোঝাবুঝি বা মান অভিমানের পালা চলে। এবং এক সময় কিশোরের সেক্রেটারি আব্দুল সাহেবের সঙ্গে দেখা হয়। ওই ব্যাপারটা যে আদৌ প্রতিশোধমূলক নয় সেটা আব্দুলকে বুঝিয়ে বলি। আব্দুলের মুখে সব কথা শুনে কিশোরকুমার তো জল। সব মান অভিমানের পালা আর ভুল বোঝাবুঝির পালা শেষ হয়ে যায় সেই মুহূর্তেই।’

কিন্তু এর ফলে সবচেয়ে বঞ্চিত হয়েছি আমরা শ্রোতারা।

রবীন্দ্রসঙ্গীতের ক্ষেত্রে সলিল চৌধুরীর বক্তব্য (আনন্দলোক ৩১শে অক্টোবর ১৯৮৭, পৃষ্ঠা ৮৩) –

‘রবীন্দ্রসঙ্গীত ওঁর কণ্ঠে একটা অন্য ডায়মেনশন এসেছে – এ বিষয় কোন সন্দেহ নেই। কিশোর ছিলেন উদাত্ত কণ্ঠের অধিকারী। হেমন্তদা (হেমন্ত মুখোপাধ্যায়) এবং সমরেশ রায়ের কাছে এ বিষয় তাঁর শিক্ষার আগ্রহ লক্ষ্য করেছি। যেটা খুবই পশংসনীয়। তবে, পংকজ মল্লিক, দেবব্রত বিশ্বাস এবং হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কন্ঠে, রবীন্দ্রসংগীত যে রূপ পেয়েছে, তার সঙ্গে কিশোরের রবীন্দ্রসংগীতের কোন তুলনা চলে না। যদিও তাঁর কন্ঠের গুণে গানগুলো উৎরে গেছে চমৎকার ভাবে।’

তাহলে দেখা যাচ্ছে যে সলিল চৌধুরীর চোখে কিশোরকুমার খুব ভাল গায়ক হলেও, সেই অর্থে পরিপূর্ন শিল্পী ছিলেন না। সব শিল্পীর মধ্যে সীমাবদ্ধতা থাকে। কিশোরকুমার নিজেও ওনার সীমাবদ্ধতা নিয়ে যথেষ্ট সচেতন ছিলেন। তবুও কিশোরকুমারের গানের গলার রেঞ্জ নিয়ে সলিল চৌধুরী খুব নিশ্চিন্ত ছিলেন। ১৬ অক্টোবর ১৯৮৭র বর্তমান পত্রিকার অষ্টম পৃষ্ঠায় সলিল চৌধুরীর স্মৃতিচারণ –

‘কিশোর ছিলেন অসাধরণ শিল্পী। ওর গানের সুর করবার সময় কখনো ভাবতে হ’ত না, যেমনটি হ’ত মুকেশের গানে সুর দেওয়ার সময়। লতার গানের সুর দিতেও ভাবতে হয় না। লতা কিশোরের গলার রেঞ্জ এমন যে, সে নিয়ে উদ্বেগের কোন কারণ থাকে না।’

তবে, আর যাই হোক, অন্য সকল সঙ্গীত পরিচালকের মত সলিল চৌধুরীও কিশোরকুমারের গানের প্রতি নিষ্ঠা নিয়ে খুব শ্রদ্ধাবান ছিলেন। ১৬ অক্টোবর ১৯৮৭র বর্তমান পত্রিকার অষ্টম পৃষ্ঠায় সলিল চৌধুরীর সাক্ষাৎকার থেকে আমরা জানতে পারি যে কিশোরকুমারের অকাল প্রয়াণ না হলে আমরা, শ্রোতারা, কিশোরকুমারের কন্ঠে নজরুলগীতি শুনতে পেতাম।

‘কিশোর ছিল গানের ব্যাপারে অত্যন্ত নিষ্ঠাবান। এই নিষ্ঠাই ওকে কিশোরকুমার করে তুলেছিল। ও যখন রবীন্দ্রসঙ্গীত রেকর্ড করলো হেমন্তদা আর সমরেশ রায়ের তত্ত্বাবধানে, আমি শুনেছি প্রতিটি নোট যাতে যথাযথভাবে লাগে, তার অভ্যাসের জন্য ১০/১২টি গানের রেকর্ডিং ও ক্যানসেল করেছিল। অনেকগুলো টাকার ব্যাপার, সে ক্ষতিও ও স্বীকার করেছিল। মেগাফোনের কমলেশ ঘোষের কাছে শুনেছি ওর নাকি এ বছরেই বারোটা নজরুলগীতি রেকর্ড করার কথা ছিল। সম্প্রতি রবীন্দ্রসঙ্গীতের ডিস্কটা বেড়োবার পরই কিশোর ঠিক করেছিল আগামী বছরে নজরুলগীতি রেকর্ড করবে। ইচ্ছেটা পূর্ণ হ’ল না।’

শুধু কি কিশোরকুমারের ইচ্ছে অপূর্ণ থেকে গেছে? না। ওনার মৃত্যুতে আমাদের মত শ্রোতাদের অনেক ইচ্ছে অপূর্ণ রয়ে গেছে। হয়তো সলিল চৌধুরীর সুরে কিশোরকুমার আরও কিছু গান গাইতেন। হয়তো পঞ্চম-কিশোরের মত সলিল-কিশোরও ভারতীয় লঘু সঙ্গীতের জগতে একটা বিশেষ অধ্যায় হতে পারত। হয়তো ……

Kanan Devi remembers Kishore Kumar

২২ আশ্বিন ১৯০৯ শকাব্দ বুধবার ২৭ আশ্বিন ১৩৯৪ বঙ্গাব্দ ১৪ অক্টোবর ১৯৮৭র আজকাল পত্রিকার শহর সংস্করণের প্রথম পাতা এখন আমার সামনে খোলা। ওই পাতায় ডান দিকে প্রধান খবর ওয়ান ডে ক্রিকেটে ওয়েস্ট ইন্ডিজের রেকর্ড ৩৬০ রান আর ভিভ রিচার্ডসের বিশ্বকাপ ক্রিকেটে ব্যক্তিগত রানের ৩৬০ রানের বিশ্বরেকর্ড। কিন্তু আমি এই খবরের জন্য এই কাগজটা প্রায় দু দশক ধরে আমার কাছে রাখি নি। রেখেছি ওই কাগজের প্রথম পাতার বাঁদিকের অনেক বড় করে লেখা প্রধান খবরের জন্য। ঠিক ধরেছেন – কিশোরকুমারের জীবনাবসান। গান শেষ। বোম্বাই বিনিদ্র। কলকাতা স্তব্ধ। বিশ্বকাপ ক্রিকেট না চললে এই খবরটাই পুরো পাতা জুড়ে থাকত।

কিশোরকুমার এবং কিশোরকুমারের গান নিয়ে আজ আমার নতুন করে কিছু বলার নেই। ওনার গান ভাষার গন্ডী ছাড়িয়ে মানুষের হৃদয়ে প্রবেশ করেছে।

আমি কিশোরকুমার সমন্ধে অনেকের লেখা এবং স্মৃতিচারণ পড়েছি। কিন্তু কাননদেবীর স্মৃতিচারণ, আমার জানা, কেবল একবারই বর্তমান পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। আমার কলেজ-জীবনে, ওই লেখা পড়ে, আমি বুঝেছিলাম যে কিশোরকুমারের গান আট থেকে আশি সবাইকে ছুঁয়েছে।

১৬ই অক্টোবার ১৯৮৭র বর্তমান পত্রিকার অষ্টম পৃষ্ঠার প্রথম কলম থেকে কাননদেবীর স্মরণ নীচে তুলে দিলাম।

অতীত দিনের খ্যাতনামা অভিনেত্রী, গায়িকা কাননদেবী কিশোর কুমারের মৃত্যুতে অত্যন্ত শোকাহত। “আমার বৌমা যখন আমাকে খবরটা দিল তখন আমি হেসে উড়িয়ে দিয়ে বলি কিশোরের আয়ু বেড়ে গেল। তখন বৌমা বল্লে, না মা খবরে আমরা দেখলাম। বিশেষ খবরগুলো আবার বলে, তাই তাড়াতাড়ি TV-র সামনে বসে পড়লাম। শুনে হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম। আমি তো এখনো ভাবতে পারছি না যে কিশোর নেই। কিবা বয়স হয়েছিল ওর – মাত্র ৫৮ বছর বয়েসে ও চলে গেল।” কথাগুলো এক নিশ্বাসে বলে গেলেন কাননদেবী। ‘ছোটদের মৃত্যু সমন্ধে বলতে কিরকম যেন লাগে। এই যে আজ ওর মরদেহ খাণ্ডোয়াতে নিয়ে যাওয়া হলো খবরে শুনলাম, আমার কিন্তু এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না। কিশোর, অশোকবাবু ওদের সঙ্গে আমাদের একটা পারিবারিক সম্পর্ক। একসঙ্গে কত বেড়িয়েছি সবাই কিশোরের সঙ্গে দেখা হয়েছে, কত গল্প গুজব গান বাজনা হয়েছে – সেসবই আজ স্মৃতি। আমি বরাবরই কিশোরের গানের ভক্ত, তবে ওর সব গানের নয়। যেগুলো সিরিয়াস গান সেগুলো অপূর্ব। আমার বাড়িতে প্রায় পঞ্চাশখানা কিশোরের গানের ক্যাসেট আছে। সব থেকে বড় ব্যাপার হ’ল একেবারে চ্যাংড়ামোর গান থেকে শুরু করে দারুণ সিরিয়াস গান ও অত্যন্ত দক্ষতার গাইতে পারত যা আর অন্য কেউ পারেন না। ওর গলা ছিল ভগবানদত্ত, ওতো কারুর কাছে শেখেওনি। এছাড়া ওর ছবিও দেখেছি কয়েকটা। অভিনেতা হিসাবেও কিশোর অনেক বড় ছিলো। আজ আমার অশোকবাবুর কথা ভেবে খারাপ লাগছে। পরপর স্ত্রী ও ভাইয়ের শোক পেলেন তিনি। সব থেকে বড় কথা হলো ভারতীয় সঙ্গীত জগতে কিশোরের অভাব কোনদিনই পূর্ণ হবে না।’