Water of India

স্কুল জীবনের কৈশোর বয়স থেকেই আমাকে এক নতুন নেশায় পেয়ে বসে । গান শোনা। শুধু গান শোনা নয়, ভাল গান শোনা। তার আগেই বাংলা গান বাড়িতে শুনতাম, সবেধন নীলমণি, Murphy Radioতে। মা মাঝে মাঝে শুনতেন। আর আমিও কান পাততাম। ছুটির দিনের দুপুরের অনুরোধের আসর আমার ভারি প্রিয় ছিল। আর প্রিয় ছিল প্রতি রবিবার রাত ৯:৩০র ছায়াছবির গান। প্রথম দিকে শুধু শুনতাম। পরে নিজের সঙ্গে একটা খেলা খেলতাম। শেষ দুটো গান কে গাইবেন? মান্না দে, কিশোরকুমার, হেমন্ত, লতা নাকি আশা? সুরকার নিয়ে ঘুব বেশী মাথা ঘামাতাম না। তাই রাহুলদেবের গান শুনেও ওনাকে আলাদা ভাবে চিনতাম না। উচ্চ বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়তে এসে শুরুতেই বাণীব্রতর কাছে “শোন মন বলি তোমায়” এর সঙ্গে পরিচিতি হয়ে গেছিল। যদিও সেটা রাহুলদেবের গান বলে জানতাম না। ওই গানটা ছিল সবার সমক্ষে না শোনার গান। আর প্রকাশ্যে হিন্দী গান। নৈবচ নৈবচ!

তবে হিন্দী গানের সঙ্গে প্রথম পরিচয় উচ্চ বিদ্যালয়ে আসার বছর খানেক আগে। প্রাথমিক বিদ্যালিয়ের পঞ্চম শ্রেণীর বাংলা ক্লাসে লাস্ট বেঞ্চি থেকে একদিন চিন্ময় হঠাৎ গেয়ে উঠল “बम्बई से आया मेरा दोस्त, दोस्त को सलाम करो”। এইটুকুই মনে আছে। গানটা যে আমাদের প্রিয় বাপ্পীদা গেয়েছেন, সেটা তখন অজানা ছিল।

ফিরে যাই নবম শ্রেণিতে। গরমকাল। স্কুলের নিয়মিত সময়ের বদলে “Morning School”। ক্লাসের periodএর ব্যাপ্তি বছরের অন্য সময়ের চেয়ে অনেক কম। স্কুলের ছুটির শেষে প্রায় চিন্ময়ের পাড়ায় যাতায়াত। একদিন ঠিক হল চিন্ময় গান বাজিয়ে শোনাবে। চিন্ময়ের বড় মামার HMVর Record Player ছিল। ততদিনে চিন্ময় সেটা চালাতে শিখে নিয়েছে। স্কুল ছুটির পরেই চিন্ময়দের বাড়ির মাঝের ঘরে আসর বসল। সঙ্গে হয় বঙ্কু অথবা দেবদূত অথবা দুজনেই ছিল। চিন্ময় দুটো EP রেকর্ড বাজিয়ে শোনাল। প্রথমাটা ছিল अमरप्रेम। আর দ্বিতীয়টা ছিল हरे राम हरे कृष्ण। গান শুনে যে আপ্লুত হয়েছিলাম, সেটা আলাদা করে বলবার প্রয়োজন অনুভব করছি না। রেকর্ডের পেছনটা পড়লাম। সেই প্রথম রাহুল দেব বর্মনকে নিজের মতন করে করে চিনলাম। শুধু চিনলাম নয়। একটা আত্মিক যোগাযোগ তৈরি হল। সেই যোগাযোগ আজও ছিন্ন হয় নি।

ইংরাজী ভাষায় “lounge music” বলে একটা বাক্যাংশ আছে। তার সঠিক বাংলা হয় না। আমার মতে রাহুলদেবের সুরে কিশোরকুমারের গাওয়া “चिंगारी कोई भडके, तो सावन उसे बुझाये” আর “कुछ तो लोग कहेंगे, लोगों का काम है कहना” গান দুটি ভারতীয় ভাষায় lounge musicএর অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শন। শুধু এই দুটো গানে নয়। অনেক গানেই সুরের মূর্ছনা আর সেই সুরকে চিত্রে রূপান্তরিত করবার অনবদ্য মেলবন্ধনকে একটা অন্য পর্যায় নিয়ে গেছিলেন কিশোরকুমার এবং রাহুলদেব বর্মনের জুটি। যা ভারতীয় লঘু সঙ্গীতে আজও বিরল।

তারপর কয়েক বছরের মধ্যে গুলজারের লেখা গানের মানে বুঝতে শুরু করার পর রাহুলদেবের গানের মধ্যে পেলাম এক অনাস্বাদিত কাব্যিক অনুভূতি।

রাহুলদেবের গানের magic আমার কাছে যাদুসম্রাট P. C. Sorcarএর Water of India magicএর মত। শেষ হবার নয়।

Advertisements