Kishore Kumar and Salil Chowdhury

কিশোরকুমার এবং সলিল চৌধু্রী দুজনেই আমার প্রিয় শিল্পী। হিন্দী এবং বাংলা মিলিয়ে সলিল চৌধুরীর পরিচালনায় কিশোরকুমারের খুব বেশী গান নেই। প্রায় সব গানই কিন্তু ভাল জনপ্রিয়তা পেয়েছে। উইকিপেডিয়াতে সলিল চৌধু্রীর উপর লেখায় কিশোরকুমারের নাম নেই। গানের সংখ্যা কম হতে পারে। কিন্তু একেবারে নাম উল্লেখ না করবার মত অবস্থা নয়। কিছু গান একেবারে অনবদ্য। যেমন হিন্দীতে গুজর যায়ে দিন দিন। বাংলায় কবিতা ছায়াছবির শুন শুন গো সবে। আমার সবচেয়ে দুঃখ লাগে যখন ভাবি যে সলিল চৌধুরীর সুরে কিশোরকুমারের কণ্ঠে কোন আধুনিক বাংলা গান নেই।

কেন এরকম হল? কোনদিন স্পষ্ট করে জানা যাবে না। এখন পর্যন্ত ইন্টানেটে এ বিষয় আলোচনা সামান্যকিশোরকুমারের মৃত্যুর পর সলিল চৌধুরী নানা পত্রিকায় কিশোরকুমারের স্মৃতিচারণ করেছিলেন। সেইরকম কিছু লেখা আমার কাছে আছে। সেই লেখাগুলো পড়ে আমার ব্যক্তিগত মতামত হল যে কোন কারণে সলিল চৌধুরীর সঙ্গে কিশোরকুমারের হয়তো মানসিক দূরত্ম তৈরী হয়েছিল। সলিল চৌধুরী কিশোরকুমারের শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের প্রথাগত শিক্ষার অভাব অনুভব করতেন। আনন্দলোকের ১৯৮৭ সালের ৩১শে অক্টোবরের সংখ্যায় (পৃষ্ঠা ৮২-৮৩) সলিল চৌধুরী বলেছেন –

‘হ্যাঁ, অসাধরণ কন্ঠ ছিল কিশোরের, এ বিষয় কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু কন্ঠ থাকলেই তো আর সব কিছু হয় না। তবে এ কথা বলবো – কিশোরের যদি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের শিক্ষাটা থাকতো, তাহলে কিশোর এক অন্য কিশোর হয়ে উঠতেন। জনপ্রিয়তা দিয়ে বিচার নয়, সাংগীতিক গুণগত সৌকর্যে কিশোর তাহলে সহজেই মহম্মদ রফির স্থানে পৌঁছোতে পারতেন। তবে সংগীতশিল্পী হিসেবে যদি কিশোরের মূল্যায়ন করতে হয়, তাহলে এটাই হয়তো সঙ্গত হবে যদি বলি : কিশোর একটা নতুন স্টাইলের উদ্ভাবন করেছেন – যেটা পপ-স্টাইলের খুব কাছাকাছি। এক্ষেত্রে ওঁর ধারেকাছে পৌঁছোবার মতো কেউ ছিল না। এ কথা আমি জোরের সঙ্গে বলতে পারি।’

এক সময় কিশোরকুমারের মনে হয়েছিল যে সলিল চৌধুরী যেশু দাসকেই বেশী পছন্দ করেন। আনন্দলোকের ওই একই সাক্ষাৎকারে সলিল চৌধুরী বলেছেন –

‘মান অভিমানের পালাও চলতো মাঝে মাঝে। মাঝে মাঝে ভুল বোঝাবুঝিও হয়েছে। যেমন : সত্তর সালের প্রথম দিকের একটা ঘটনা। বাসু ভট্টাচার্যের ‘অন্দর মহল’ নামে একটা ছবির সংগীত পরিচালনার কাজ করছি। ওই ছবিতে যেশু দাসকে দিয়ে আমি একটা গান করাই। এর আগে একটা ছবির গানের জন্য কিশোরকে বলেছিলাম। যে কোন কারণে হোক, সেই ছবিতে কিশোর গাইতে পারেননি। কিশোর ধরে নিয়েছিলেন বাসুবাবুর ছবিতে যেশুকে দিয়ে গান গাইয়ে আমি প্রতিশোধ নেবার চেষ্টা করেছি। ব্যাপারটা অবশ্য আদৌ তা ছিল না। অনেকদিন এই ভুল বোঝাবুঝি বা মান অভিমানের পালা চলে। এবং এক সময় কিশোরের সেক্রেটারি আব্দুল সাহেবের সঙ্গে দেখা হয়। ওই ব্যাপারটা যে আদৌ প্রতিশোধমূলক নয় সেটা আব্দুলকে বুঝিয়ে বলি। আব্দুলের মুখে সব কথা শুনে কিশোরকুমার তো জল। সব মান অভিমানের পালা আর ভুল বোঝাবুঝির পালা শেষ হয়ে যায় সেই মুহূর্তেই।’

কিন্তু এর ফলে সবচেয়ে বঞ্চিত হয়েছি আমরা শ্রোতারা।

রবীন্দ্রসঙ্গীতের ক্ষেত্রে সলিল চৌধুরীর বক্তব্য (আনন্দলোক ৩১শে অক্টোবর ১৯৮৭, পৃষ্ঠা ৮৩) –

‘রবীন্দ্রসঙ্গীত ওঁর কণ্ঠে একটা অন্য ডায়মেনশন এসেছে – এ বিষয় কোন সন্দেহ নেই। কিশোর ছিলেন উদাত্ত কণ্ঠের অধিকারী। হেমন্তদা (হেমন্ত মুখোপাধ্যায়) এবং সমরেশ রায়ের কাছে এ বিষয় তাঁর শিক্ষার আগ্রহ লক্ষ্য করেছি। যেটা খুবই পশংসনীয়। তবে, পংকজ মল্লিক, দেবব্রত বিশ্বাস এবং হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কন্ঠে, রবীন্দ্রসংগীত যে রূপ পেয়েছে, তার সঙ্গে কিশোরের রবীন্দ্রসংগীতের কোন তুলনা চলে না। যদিও তাঁর কন্ঠের গুণে গানগুলো উৎরে গেছে চমৎকার ভাবে।’

তাহলে দেখা যাচ্ছে যে সলিল চৌধুরীর চোখে কিশোরকুমার খুব ভাল গায়ক হলেও, সেই অর্থে পরিপূর্ন শিল্পী ছিলেন না। সব শিল্পীর মধ্যে সীমাবদ্ধতা থাকে। কিশোরকুমার নিজেও ওনার সীমাবদ্ধতা নিয়ে যথেষ্ট সচেতন ছিলেন। তবুও কিশোরকুমারের গানের গলার রেঞ্জ নিয়ে সলিল চৌধুরী খুব নিশ্চিন্ত ছিলেন। ১৬ অক্টোবর ১৯৮৭র বর্তমান পত্রিকার অষ্টম পৃষ্ঠায় সলিল চৌধুরীর স্মৃতিচারণ –

‘কিশোর ছিলেন অসাধরণ শিল্পী। ওর গানের সুর করবার সময় কখনো ভাবতে হ’ত না, যেমনটি হ’ত মুকেশের গানে সুর দেওয়ার সময়। লতার গানের সুর দিতেও ভাবতে হয় না। লতা কিশোরের গলার রেঞ্জ এমন যে, সে নিয়ে উদ্বেগের কোন কারণ থাকে না।’

তবে, আর যাই হোক, অন্য সকল সঙ্গীত পরিচালকের মত সলিল চৌধুরীও কিশোরকুমারের গানের প্রতি নিষ্ঠা নিয়ে খুব শ্রদ্ধাবান ছিলেন। ১৬ অক্টোবর ১৯৮৭র বর্তমান পত্রিকার অষ্টম পৃষ্ঠায় সলিল চৌধুরীর সাক্ষাৎকার থেকে আমরা জানতে পারি যে কিশোরকুমারের অকাল প্রয়াণ না হলে আমরা, শ্রোতারা, কিশোরকুমারের কন্ঠে নজরুলগীতি শুনতে পেতাম।

‘কিশোর ছিল গানের ব্যাপারে অত্যন্ত নিষ্ঠাবান। এই নিষ্ঠাই ওকে কিশোরকুমার করে তুলেছিল। ও যখন রবীন্দ্রসঙ্গীত রেকর্ড করলো হেমন্তদা আর সমরেশ রায়ের তত্ত্বাবধানে, আমি শুনেছি প্রতিটি নোট যাতে যথাযথভাবে লাগে, তার অভ্যাসের জন্য ১০/১২টি গানের রেকর্ডিং ও ক্যানসেল করেছিল। অনেকগুলো টাকার ব্যাপার, সে ক্ষতিও ও স্বীকার করেছিল। মেগাফোনের কমলেশ ঘোষের কাছে শুনেছি ওর নাকি এ বছরেই বারোটা নজরুলগীতি রেকর্ড করার কথা ছিল। সম্প্রতি রবীন্দ্রসঙ্গীতের ডিস্কটা বেড়োবার পরই কিশোর ঠিক করেছিল আগামী বছরে নজরুলগীতি রেকর্ড করবে। ইচ্ছেটা পূর্ণ হ’ল না।’

শুধু কি কিশোরকুমারের ইচ্ছে অপূর্ণ থেকে গেছে? না। ওনার মৃত্যুতে আমাদের মত শ্রোতাদের অনেক ইচ্ছে অপূর্ণ রয়ে গেছে। হয়তো সলিল চৌধুরীর সুরে কিশোরকুমার আরও কিছু গান গাইতেন। হয়তো পঞ্চম-কিশোরের মত সলিল-কিশোরও ভারতীয় লঘু সঙ্গীতের জগতে একটা বিশেষ অধ্যায় হতে পারত। হয়তো ……

2 thoughts on “Kishore Kumar and Salil Chowdhury

  1. dada,
    aapnaar ei page ta thheke onek kichhu jaante paarlaam.
    khub bhalo laglo…ami kishore kumar er pagol fan…aar salil chowdhury’r shuur bhishon bhalo laage…..
    ami ekbaar screen mag e porechhilam…salil bolechhen…je uni kishore er talent bujhte bhul korechhilen….by the time 1970’s came kishore was not only one of the best singers in india but one of the best in the world…eta quote unquote chhilo…
    khub bhalo laaglo aapnaar page ta pore..
    regards.
    kishore.

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s